সাগরের মৎস্য সম্পদ রক্ষার জন্য শেষ পর্যন্ত ভারতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশের জলসীমায়ও বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেয়া এই সিদ্ধান্ত দেশের মৎস্য সেক্টরে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের জলসীমায় ৬৫ দিনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে ৫৮ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের মৎস্য গবেষকগণ মাছ শিকার বন্ধের সময়সীমা পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। অবশেষে সেই দাবি মেনে নেয়ায় বাংলাদেশের মৎস্যসম্পদের উৎপাদন প্রত্যাশা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। দেশের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের জারি করা নতুন প্রজ্ঞাপন সংশ্লিষ্টদের উচ্ছ্বসিত করেছে।
দেশের গভীর সাগরে মাছ শিকারে নিয়োজিত একাধিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেছেন, নতুন সিদ্ধান্তে মৎস্য প্রজননের সময়কাল ঠিকঠাকভাবে রক্ষা পাবে। যা দেশের এই খাতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সূত্র জানিয়েছে, দেশের মেরিন ফিশারিজ অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী ২০১৫ সাল থেকে সাগরে মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় প্রতিবছর ৬৫ দিন বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকার বন্ধ রাখা হয়। প্রথমে শুধুমাত্র ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলারগুলো এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় রাখা হয়। সাধারণ নৌযানগুলো ওই সময় মাছ ধরতে পারতো। পরবর্তীতে ২০১৯ সাল থেকে সব ধরনের নৌযানকে নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে প্রতিবছর ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিন দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের কয়েক লাখ জেলে চরম দুরবস্থায় পড়েন। ওই সময়ে সরকার জেলেদের কিছু সহায়তা দিলেও জীবনধারণের জন্য যা পর্যাপ্ত নয় বলে জেলেরা অভিযোগ করে আসছিলেন।
বাংলাদেশের জেলেদের জন্য নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকলেও ওই সময়ে সাগরের একটি বড় অংশে ভারতের জেলেরা মাছ শিকার করতে পারতো।বাংলাদেশের জলসীমায় কোনো ট্রলার বা নৌযান না থাকলেও একই সাগরের ভারতের জলসীমায় হাজার হাজার নৌযান মাছ শিকার করতো। বহু ভারতীয় জেলে ও নৌযান ওই সময় বাংলাদেশের জলসীমা থেকে মাছ শিকার করে নিয়ে যেতো বলেও অভিযোগ করে আসছিলেন দেশের মাছ শিকারে নিয়োজিত জেলেসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। তারা অভিযোগ করে আসছিলেন যে, বাংলাদেশের জলসীমায় নিষেধাজ্ঞা চলাকালে প্রায় ৩৯ দিন ভারতীয় জেলেরা এ দেশের জলসীমায় ঢুকে মাছ ধরে নিয়ে যেত।
এছাড়া নিষেধাজ্ঞা শেষে বাংলাদেশের জেলেরা সাগরে গিয়ে পর্যাপ্ত মাছ না পাওয়ার হতাশাও ব্যক্ত করতেন। অপরদিকে প্রজননের জন্য মাছ শিকার বন্ধ রাখা হলেও দেখা যেতো ডিম ভর্তি মাছ ধরা পড়ছে। জেলেদের অভিযোগ সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ না নেয়ার ফলে মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা শুধু জেলেদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে মৎস্য প্রজননে কোনো ভালো ভূমিকা রাখছে না। দেশের বিভিন্ন এলাকায় জেলেরা নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা পুনর্বিন্যাসের দাবিতে নৌ অবরোধ, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন আন্দোলন করেছেন। দেশের মৎস্য গবেষকেরাও মাছ শিকার বন্ধের সময়সীমা নির্ধারণে গবেষণা করার প্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন।
মৎস্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, মাছের সুষ্ঠু প্রজনন, বেড়ে ওঠা ও টেকসই আহরণের জন্য বঙ্গোপসাগরে ভারত ও বাংলাদেশ সরকার বছরের নির্দিষ্ট একটি সময়ে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দেয়। প্রতিবছর বাংলাদেশের জলসীমায় এই নিষেধাজ্ঞা থাকে ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই ৬৫ দিন। আর ভারতের জলসীমায় ১৫ এপ্রিল থেকে ১৪ জুন (৬১ দিন)। বাংলাদেশের নিষেধাজ্ঞার সুফল ভারতীয় জেলেরা তুলে নিতো বলেও অভিযোগ ছিল দেশের জেলেদের। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের সব পরামর্শ ও জেলেদের আন্দোলন বরাবরই উপেক্ষিত ছিল।
অবশেষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মাছ ধরার উপর নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা পুনর্বিন্যাস করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এতে প্রতিবছর ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ৫৮ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সময়ে নিষেধাজ্ঞা থাকবে বঙ্গোপসাগরের ভারতের জলসীমায়ও। এ ক্ষেত্রে ভারতের নিষেধাজ্ঞো বলবৎ থাকার দুদিন আগে বাংলাদেশের সামুদ্রিক জলসীমায় নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়ে যাবে। মন্ত্রণালয়ের সামুদ্রিক মৎস্য–২ শাখার উপসচিব এইচ এম খালিদ ইফতেখার রাষ্ট্রপতির নির্দেশক্রমে গত রোববার এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছেন। সরকারের এই সিদ্ধান্তে মৎস্য গবেষক, জেলে ও ব্যবসায়ীরা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
ভারতের সঙ্গে মিল রেখে এই সিদ্ধান্ত নেয়া কে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত বলে মনে করেছেন ট্রলারের মালিকপক্ষ। তারা বলছেন , ‘এটা দেশের সামুদ্রিক মৎস্য খাতের জন্য সরকারের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আমরা দীর্ঘদিন ধরেই এমন দাবি করে আসছিলাম। কারণ, আগে সরকার যে উদ্দেশে এই নিষেধাজ্ঞা দিত, তা দুই দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকায় প্রতিবেশী দেশ লাভবান হতো। এটা আমাদের মৎস্যসম্পদের জন্য একটি বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
নতুন করে নিষেধাজ্ঞার যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে তাতে ভারত ও বাংলাদেশের নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ প্রায় একই থাকবে। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে দেশের সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ রক্ষা পাবে এবং জেলেরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন না বলেও মন্তব্য করেন ট্রলারের মালিকপক্ষ।
জেলা মৎস্য অধিদফতরের একজন কর্মকর্তা বলেন, এতদিন নিষেধাজ্ঞার সময়সীমায় দুই দেশের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকায় বাংলাদেশের মৎস্যখাত ক্ষতির মুখে পড়েছিল। এখন এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে সমুদ্রে মাছের উৎপাদন বাড়বে এবং জেলেদের কষ্টও কিছুটা কমবে।
তিনি বলেন, এতে মাছের উৎপাদন বাড়বে। দেশে আমিষের যোগানের পাশাপাশি বিদেশে মাছ রপ্তানির পরিমাণ বাড়বে। যা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
তবে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মাছ ধরার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে সমন্বয় করে সহযোগিতা করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে সবার ধারণা।
কালের সমাজ//এ.জে
আপনার মতামত লিখুন :